জানতে ইচ্ছা করে কয়জন আহত সাংবাদিক তালিকাভুক্ত হয়েছেন
মন্তব্য কলাম:
বৈষম বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আহত সংবাদ কর্মীদের পাশে থাকেনি কেউই, আমি সহ ঐদিন আহত হয়েছিল জাগো নিউজ নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি শ্রাবণ, nan tv শাহজাহান চৌধুরী মাসুম, যুগান্তরের ফতুল্লা প্রতিনিধি আলামিন প্রধান সহ কিছু সংবাদকর্মী। মনে পড়ে ১৮ জুলাই সকাল সাতটা টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম সাইনবোর্ড এলাকায় থমথমে পরিস্থিতিতে তখন শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আর গণমাধ্যম কর্মীরা ছাড়া সাইনবোর্ড এলাকাটি ছিল পুরোটাই ফাঁকা। সাড়ে নয়টার দিকে খবর পাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ফারহানা মুনা, তরিকুল সুজনসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে বিশাল মিছিল নিয়ে চাষাড়াতে আসছে (আমি সাইনবোর্ড আসার সময় দেখে আসছিলাম ওরা দুই নম্বর রেলগেট রেল লাইনের উপর অবস্থান নিয়েছে)।
যাইহোক, খবর পেয়ে ছুটে আসলাম চাষাড়ার দিকে। এসে দেখি তুলকালাম কান্ড! আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের নির্বিচারে গুলিবর্ষণ টিয়াররসেল কাঁদানো গ্যাস নিক্ষেপে পুরো এলাকাটিকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ঐদিন সাহসী ছেলে মেয়েরা বুক পেতে দিয়েছিল 'হয় মৃত্যু নয় মুক্তি'। তাদের এই অভূতপূর্ব সাহসিকতা দেখার সৌভাগ্যবান সাক্ষী হয়েছিলাম সেদিন। সময় যত যাচ্ছে ততই তাণ্ডব বাড়ছে পুলিশের বেপরোয়া গুলিবর্ষণে আন্দোলনকারীদের কে যেন আরও তাতিয়ে তুলেছিল কাছ থেকে দেখেছি পুলিশ আন্দোলনকারীদের কে গুলি আর ধাওয়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল তারপরও দমাতে পারিনি অকুতোভয় তরুণ বীর সেনানিদের একপর্যায়ে কিছু পুলিশ অফিসার আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের সাথে মোবাইলে ফোন করে তাদের পাশে থেকে আন্দোলনকারীদের উপর হামলার জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছিলো, কিছু সময় পরেই ছাত্রলীগের ক্যাডাররা সশস্ত্র অবস্থায় চাষাড়া বালুর মাঠের দিকে দিয়ে এসে পুলিশের সাথে যোগ দিয়ে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেয়। কোন সংবাদ কর্মী ছিল না আমি কোনভাবে নিজেকে সেফ রেখে পুলিশ ও ছাত্রলীগের যৌথভাবে আন্দোলনকারীদের হামলার বেশ কিছু ছবি তুলি।
ওই সময়টাতে কোন পক্ষই সংবাদকর্মীদের বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওই পরিস্থিতিতে কাজ করাটা চরমপর্যায়ের ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আমি ওদের ছবি তুলে আবার চাষাড়ার দিক ফিরে আসি এর মধ্যে খবর পেলাম শ্রাবণ পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে অবস্থা সংকটাপণ্য মনটা খারাপ হলো কারণ ওর সাথে সকাল ১০ টা বাজে আমার দেখা হয়েছিল, খুব অল্প সংখ্যক সংবাদ কর্মী ঐদিন মাঠে থাকতে পেরেছিল যাইহোক আমি চাষাড়া বিজয়স্তম্ভের মোড়ে এসে দেখি মিশন পাড়া, বি বি রোড, মহিলা কলেজের সামনে ত্রিমুখী লড়াই চলছে পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের শুনলাম পুলিশের গুলিতে মহিলা কলেজের সামনে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে সাথে সাথে দৌড় দিলাম গিয়ে দেখি জয়নাল ট্রেড সেন্টারের সিঁড়িতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একটি ছেলে পড়ে রয়েছে ছেলেটার পুরা মাথা এবং মুখ রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে ছবি তুললাম কয়েকটা ক্লিক করার পরে ছেলেটি বলে উঠল ভাইয়া আমাকে বাঁচান কোন কিছু চিন্তা না করেই ছেলেটিকে ধরাধরি করে একটি অটোরিকশা উঠালাম কিন্তু ছেলেটির সাথে যেতে চাইলো না কেউ কারণ ওই সময় তুমুল গোলাগুলি চলছে ওর সাথের একটি ছেলে আর আমি ছেলেটিকে নিয়ে হাসপাতালের দিক রওনা দিলাম গোলাগুলির মধ্যেই এক হাতে ক্যামেরা উঁচু করে আল্লাহর নাম নিয়ে, হাসপাতালে নিয়ে ছেলেটিকে ভর্তি করিয়ে তার বাবার কাছে ফোন করে চাষাড়ার দিকে ফিরে আসি গুলিবিদ্ধ ছেলেটির নাম ছিল জুবায়ের সে সোনারগা ইউনিভার্সিটি ছাত্র।
চাষাড়া ফিরে এসে আবারো কিছু ছবি তুলতে লাগলাম এমন সময় পপুলারের নিচে হঠাৎ আমাকে ৬০-৭০ জন ঘিরে ফেলল কোন কথা না বলেই তারা আমার উপর চড়াও হল যে যেভাবে পারছে কিল ঘুসি সাথে ক্যামেরা নিয়ে টানা হেচরা কথা বলা বা শোনার কোন সুযোগই দিল না নিশ্চিত হলাম ওরা আমার ক্যামেরাটা ভেঙে ফেলবে আর হয়তো আমাকে মেরেও ফেলতে পারে ওরা আমার ক্যামেরাটা ভেঙে ফেলল তারপর পরে আমার মাথায় দুই দিক থেকে এসএস পাইপ দিয়ে বাড়ি মারলো সাথে সাথে মাথা ফেটে গেল এর মধ্যে ছাত্ররা চাষাড়া বালুর মাঠ থেকে পপুলারের যে ছোট রাস্তা ওই রাস্তা দিয়ে দৌড় দিয়ে এলো ওদেরকে আসতে দেখেই হামলাকারীরা সটকে পরে ওরা আমাকে চিনতে পেরে উদ্ধার করে চাষাড়ামোড়ে নিয়ে গেল সেখানে সাংবাদিকরা দেখে ছুটে এসে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
বলে রাখি ঠিক এর ১৭ দিন আগেই আমার মা ইন্তেকাল করেন, জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরে স্বাভাবিকভাবেই দেশের আন্দোলনকারি আহত নিহত সেনানিদের মূল্যায়ন শুরু হয়। সরকার থেকে শুরু করে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পাশে দাঁড়ায়।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন চলাকালীন যে সকল সংবাদ কর্মীরা নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করা কালীন যারা আহত হয়েছেন সংখ্যাটি কম কিন্তু তাদের খোঁজ কজনা নিয়েছেন? আজকে জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে আন্দোলনে আহত নিহতদের তালিকা করা হচ্ছে প্রায় এক বছর হয়ে গেল জানতে ইচ্ছা করে কয়জন আহত সাংবাদিক তালিকাভুক্ত হয়েছেন? কারা এই তালিকার দায়িত্বে ছিলেন? রাজনীতিবিদ, জেলা প্রশাসন, সাংবাদিকদের বাতিঘর প্রেসক্লাব এদের হীনমন্যতায় আবাক হইনি, একজন আহত সাংবাদিককেও এরা কোন খোঁজ খবর রাখেনি। হ্যাঁ ব্যতিক্রম আছে বিশেষ করে আমার বেলায় বলছি আমি আক্রান্ত হবার পরে সাংবাদিক আব্দুস সালাম চাচা, প্রথম আলোর পলাশ, আহসান সাদিক শাওন, প্রেস নারায়ণগঞ্জের ফখরুল, ডেইলি স্টারের সৌরভ, দেশ টিভির বিল্লাল, প্রথম আলো শিমুল, ফটোসাংবাদিক শ্যামল কাকা, কচি, আরিফ সহ কিছু সহকর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে আমার খোঁজ খবর নিয়েছেন।
রাজনীতিবিদদের মধ্যে খোঁজ নিয়েছেন ফারহানা মুনা ও নিজেই তখন ফেরারি ছিল কারণ নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনটা ওর হাত দিয়েই শুরু হয়েছিল মুনা ছিল তখন নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনের মোস্ট ওয়ান্টেড। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব টিপু কাকা, জামাতে ইসলামীর মমিন তাদের প্রতি অন্তরের অন্তস্থল থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
পুঃনশ্চ, নারায়ণগঞ্জের জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিউজ নারায়ণগঞ্জের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আন্দোলনে আহত চার জন সংবাদকর্মীকে সংবর্ধনা দিয়েছে। আরো অনেক কিছু লেখার ছিল পরে হয়তো লিখবো......
লেখক: মনিরুল ইসলাম সবুজ
ফটো সাংবাদিক, দৈনিক নয়াদিগন্ত

মতামত দিন